নামজারি বাতিল বা না-মঞ্জুর হলে করণীয় ও আইনি প্রতিকার

📅 সর্বশেষ আপডেট: 24 October, 2026

অনলাইনে জমির নামজারি বা ই-মিউটেশন আবেদন করার পর সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড কর্তৃক আবেদন না-মঞ্জুর (Reject) বা বাতিল হলে নাগরিকগণ প্রায়ই চরম বিভ্রান্তি ও উদ্বেগে পড়েন। তবে জমিজমা আইনের বিধান অনুসারে আবেদন একবার বাতিল হলেই মালিকানা শেষ হয়ে যায় না। দ্য স্টেট একুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি অ্যাক্ট (SAT Act, 1950)-এর ১৫০ ধারা এবং ভূমি আপিল বোর্ড আইন অনুযায়ী নাগরিকদের জন্য সুস্পষ্ট আইনি প্রতিকার, মিস আপিল ও রিভিউ করার অধিকার সুরক্ষিত রয়েছে। নিচে আবেদন বাতিলের প্রধান কারণসমূহ এবং প্রতিকার পাওয়ার ৩টি কার্যকর আইনি উপায় বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

১. নামজারি আবেদন বাতিল বা না-মঞ্জুর হওয়ার শীর্ষ ৫টি কারণ

এসিল্যান্ডের আদেশে সাধারণত নির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ থাকে। যেসব কারণে বেশিরভাগ আবেদন নামঞ্জুর হয়:

  • ভায়া দলিলের চেইনে ঘাটতি (Missing Chain of Title): শেষ রেকর্ডিয় মালিক থেকে বর্তমান বিক্রেতা পর্যন্ত ধারাবাহিক দলিলের মধ্যে কোনো একটি দলিল নিখোঁজ থাকলে বা লিঙ্ক স্পষ্ট না হলে।
  • জমির পরিমাণের গরমিল (Area Discrepancy): বিক্রেতার খতিয়ানে যে পরিমাণ জমি অবশিষ্ট ছিল, দলিলে তার চেয়ে বেশি জমি বিক্রি করা হলে বা হিস্যার বেশি বিক্রি হলে।
  • হালনাগাদ খাজনা (ভূমি উন্নয়ন কর) বকেয়া: আবেদনের পূর্বে পূর্ববর্তী খতিয়ানের চলতি খাজনা পরিশোধ না করা হলে।
  • বাস্তব দখল না থাকা (Lack of Physical Possession): তহশিলদারের সরেজমিন তদন্তে যদি দেখা যায় জমিতে আবেদনকারীর কোনো বাস্তব দখল নেই কিংবা অন্য কোনো পক্ষ সেখানে বসবাস বা ভোগদখল করছে।
  • সহ-ওয়ারিশদের আপত্তি বা দেওয়ানি মামলা: ওয়ারিশান সম্পত্তিতে অন্য কোনো ওয়ারিশ কর্তৃক লিখিত আপত্তি দাখিল হলে কিংবা আদালতে স্বত্ব বা বণ্টন মোকদ্দমা চলমান থাকলে।

২. আবেদন বাতিলের পর নাগরিকের সামনে ৩টি সুনির্দিষ্ট আইনি প্রতিকার

আদেশের সার্টিফাইড কপি হাতে পাওয়ার পর আপনি নিচের ৩টি পদক্ষেপের যেকোনো একটি গ্রহণ করতে পারেন:

প্রতিকার ১: এসিল্যান্ড বরাবর পুনর্বিবেচনা (Review) আবেদন

যদি আদেশটিতে কোনো স্পষ্ট তথ্যগত বা গাণিতিক ভুল থাকে, অথবা আপনি এমন কোনো নতুন দলিল উপস্থাপন করতে পারেন যা পূর্ববর্তী শুনানিতে উপস্থিত করা যায়নি—তবে এসিল্যান্ডের আদেশের ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে একই সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর পুনর্বিবেচনার (Review) দরখাস্ত দাখিল করতে পারেন।

প্রতিকার ২: অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) / ADC Revenue বরাবর মিস আপিল

SAT Act 1950 এর ১৫০ ধারা মোতাবেক এসিল্যান্ডের যেকোনো অন্যায়, পক্ষপাতদুষ্ট বা আইনবহির্ভূত না-মঞ্জুর আদেশের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এর আদালতে আনুষ্ঠানিক মিস আপিল (Revenue Appeal Case) দায়ের করতে হয়। আপিল দায়েরের আইনগত সময়সীমা আদেশের তারিখ থেকে ৩০ দিন।

প্রতিকার ৩: প্রয়োজনীয় ত্রুটি সংশোধন করে সম্পূর্ণ নতুন আবেদন দাখিল

যদি বাতিল হওয়ার কারণটি খুব সাধারণ হয় (যেমন: খাজনা দাখিলা ঝাপসা ছিল, ওয়ারিশ সনদে নাম ভুল ছিল কিংবা একটি ভায়া দলিল বাদ পড়েছিল)—তবে কোর্টে আপিল মামলা না করে ত্রুটিপূর্ণ কাগজটি সংগ্রহ করে পুনরায় অনলাইনে নতুন আবেদন করাই সবচেয়ে দ্রুত ও সাশ্রয়ী সমাধান। আবেদনের নিয়ম ও নির্ধারিত ১,১৭০ টাকার সরকারি ফি জানতে দেখুন আমাদের নামজারি ও ফি নির্দেশিকা।

৩. এডিসি (রেভিনিউ) বরাবর আপিল করার প্রক্রিয়া ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র

যদি এসিল্যান্ডের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করার সিদ্ধান্ত নেন, তবে একজন অভিজ্ঞ ল্যান্ড আইনজীবীর মাধ্যমে নিচের নথিপত্র সহ আপিল মেমো দাখিল করতে হবে:

  • এসিল্যান্ড অফিসের মূল না-মঞ্জুর আদেশের সার্টিফাইড কপি (সহি মোহরযুক্ত নকল)।
  • আপিলকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র ও ওকালতনামা।
  • জমির মূল সাফ-কবলা/হেবা দলিল, ভায়া দলিল এবং পূর্ববর্তী খতিয়ানের কপি।
  • তহশিলদার বা কানুনগোর তদন্ত রিপোর্টের নকল (যদি ভুল রিপোর্ট দেওয়া হয়ে থাকে)।
  • নির্ধারিত কোর্ট ফি ও স্ট্যাম্প।
⏱️ ৩০ দিনের তামাদি সময় পার হলে কী করবেন?

যদি যৌক্তিক কোনো কারণে (যেমন অসুস্থতা, বিদেশে থাকা বা আদেশের কপি দেরিতে পাওয়া) ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করা সম্ভব না হয়, তবে তামাদি আইন (Limitation Act)-এর ৫ ধারা মোতাবেক বিলম্ব মার্জনার দরখাস্ত (Condonation of Delay) সহ আপিল দায়ের করা যায়।

৪. নামজারি বাতিল ও আপিল সংক্রান্ত বহুল জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন: নামজারি বাতিল হলে কি সরকারি ১,১৭০ টাকা ফি ফেরত পাওয়া যায়?

আবেদন বাতিলের ক্ষেত্রে প্রাথমিক কোর্ট ফি ও নোটিশ ফি (৭০ টাকা) ফেরতযোগ্য নয়। তবে আবেদন মঞ্জুর না হলে পরবর্তী ১,১০০ টাকা ডিচিআর ফি কাটতেই হয় না, ফলে সেই টাকা আপনার সুরক্ষিত থাকে।

প্রশ্ন: নামজারি বাতিলের কারণে কি জমি থেকে কাউকে উচ্ছেদ করা যায়?

না। নামজারি মূলত রাজস্ব আদায়ের জন্য সরকারি রেকর্ড সংশোধন মাত্র। রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের মাধ্যমে সৃষ্ট স্বত্ব বা মালিকানা নামজারি বাতিলের মাধ্যমে নষ্ট হয় না এবং কাউকে জোরপূর্বক জমি থেকে উচ্ছেদ করা যায় না।

প্রশ্ন: নতুন আবেদনের পূর্বে কী কী সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত?

আগের আদেশের মূল আপত্তিটি সমাধান করুন। দলিলের ঘাটতি মেটাতে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে সহি মোহর নকল সংগ্রহ করুন এবং আমাদের ডকুমেন্টস চেকার টুল দিয়ে সম্পূর্ণ মিলিয়ে আবেদন করুন।

সর্বশেষ হালনাগাদ: 24 October 2026 বিভাগ: নামজারি ও ই-মিউটেশন

নামজারি ও ই-মিউটেশন বিভাগের অন্যান্য সম্পর্কিত গাইড

নামজারি আবেদনের বর্তমান অবস্থা (Status) চেক ও ট্র্যাকিং → ওয়ারিশ সূত্রে নামজারি করার সম্পূর্ণ নিয়ম ও কাগজপত্র →