ওয়ারিশ সূত্রে নামজারি করার সম্পূর্ণ নিয়ম ও কাগজপত্র

📅 সর্বশেষ আপডেট: 24 October, 2026

পিতা-মাতা, স্বামী বা অন্য কোনো পূর্বপুরুষের মৃত্যুর পর ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির মালিকানা সরকারি রেকর্ড ও খতিয়ানে হালনাগাদ করা প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি দায়িত্ব। ওয়ারিশ সূত্রে জমির নামজারি (ই-মিউটেশন) না করালে ভবিষ্যতে সেই জমি বিক্রি, খাজনা (ভূমি উন্নয়ন কর) পরিশোধ, ব্যাংক ঋণ গ্রহণ কিংবা সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তিতে চরম জটিলতা সৃষ্টি হয়। নিচে ওয়ারিশান নামজারির ৫টি পূর্বশর্ত, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, যৌথ বনাম পৃথক খতিয়ান তৈরির নিয়ম এবং ধাপে ধাপে অনলাইন আবেদন পদ্ধতি বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

১. ওয়ারিশ সূত্রে নামজারির ৫টি অপরিহার্য পূর্বশর্ত ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

উত্তরাধিকার সূত্রে নামজারি আবেদন করার পূর্বে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড অফিসের নির্দেশনা অনুযায়ী নিচের কাগজপত্রগুলো সঠিকভাবে প্রস্তুত রাখুন:

  • ডিজিটাল ওয়ারিশ কায়েম সনদ (Succession Certificate): স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র কিংবা সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর কর্তৃক ইস্যুকৃত কিউআর কোডযুক্ত ডিজিটাল ওয়ারিশ সনদপত্র। এতে মূল মৃত ব্যক্তির সকল জীবিত ওয়ারিশের নাম, সম্পর্ক, বয়স ও এনআইডি নম্বর সুস্পষ্ট থাকতে হবে।
  • মূল রেকর্ডিয় মালিকের মৃত্যু সনদপত্র (Death Certificate): সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষ কর্তৃক রেজিস্ট্রিকৃত অফিশিয়াল মৃত্যু নিবন্ধন সনদ।
  • মৃত ব্যক্তির নামের সর্বশেষ রেকর্ডিয় খতিয়ান বা দলিল: যে সম্পত্তির নামজারি করা হবে, তা মৃত ব্যক্তির নামে সিএস, এসএ, আরএস বা বিএস রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে অথবা তার নামে রেজিস্ট্রিকৃত সাফ-কবলা/হেবা দলিল থাকতে হবে।
  • হালনাগাদ ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) দাখিলা: চলতি বাংলা সন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট খতিয়ানের জমির সকল বকেয়া ও হাল খাজনা পরিশোধের সরকারি দাখিলা।
  • সকল ওয়ারিশের জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) ও ছবি: আবেদনকারী এবং সনদে উল্লেখিত সকল সহ-ওয়ারিশের রঙিন এনআইডি কপি ও ছবি। নাবালক ওয়ারিশ থাকলে তার জন্মনিবন্ধন ও বৈধ অভিভাবকের প্রত্যয়নপত্র।
💡 গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ:

ওয়ারিশান সনদে কোনো একজন ওয়ারিশের নাম বাদ পড়লে কিংবা নামের বানানে এনআইডির সাথে গরমিল থাকলে এসিল্যান্ড শুনানি পর্যায়ে আবেদন সরাসরি বাতিল করে দেন। তাই আবেদনের পূর্বে আমাদের নামজারি কাগজপত্র চেকার টুল দিয়ে সকল নথি মিলিয়ে নিন।

২. যৌথ নামজারি বনাম পৃথক নামজারি: আপস বণ্টননামার ভূমিকা

ওয়ারিশ সূত্রে নামজারি করার ক্ষেত্রে নাগরিকরা সাধারণত দুটি পদ্ধতির যেকোনো একটি বেছে নিতে পারেন:

ক. যৌথ ওয়ারিশান নামজারি (Joint Khatian)

মৃত ব্যক্তির সকল ওয়ারিশ মিলে একটিমাত্র আবেদনের মাধ্যমে ফারায়েজ অনুযায়ী প্রত্যেকের অংশ উল্লেখ করে যৌথভাবে একটি খতিয়ান তৈরি করতে পারেন। এই পদ্ধতিতে কোনো রেজিস্ট্রিকৃত আপস বণ্টননামা দলিল লাগে না। এটি সবচেয়ে সহজ ও দ্রুত প্রক্রিয়া।

খ. পৃথক নামজারি বা জমাভাগ (Separate Khatian)

যদি ওয়ারিশগণ নিজেদের মধ্যে জমি পরিমাপ করে নির্দিষ্ট দাগ ও সীমানায় আলাদা আলাদা খতিয়ান চান, তবে ১৯০৮ সালের রেজিস্ট্রেশন আইনের ১৭ ধারা অনুসারে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে রেজিস্ট্রিকৃত আপস বণ্টননামা দলিল (Partition Deed) তৈরি করে আবেদনের সাথে আপলোড করা বাধ্যতামূলক।

৩. ধাপে ধাপে অনলাইনে ওয়ারিশ সূত্রে নামজারি আবেদন করার নিয়ম

বাংলাদেশ ভূমি মন্ত্রণালয়ের mutation.land.gov.bd পোর্টালে গিয়ে নিচের ৫টি ধাপে আবেদন সম্পন্ন করতে হবে:

  1. লগইন ও মালিকানা সূত্র নির্বাচন: পোর্টালে মোবাইল নম্বর ও এনআইডি দিয়ে প্রবেশ করে মালিকানার সূত্র হিসেবে 'উত্তরাধিকার' অপশন সিলেক্ট করুন।
  2. মৃত ব্যক্তির তথ্য পূরণ: মূল রেকর্ডিয় মালিকের নাম, মৃত্যুর তারিখ, মৃত্যু সনদের নম্বর এবং সর্বশেষ খতিয়ান ও দাগ নম্বর প্রদান করুন।
  3. সকল ওয়ারিশের নাম ও অংশ সংযোজন: আবেদনকারী নিজে গ্রহীতা হয়ে 'সহ-ওয়ারিশ সংযোজন' বাটনে ক্লিক করে প্রতিটি ভাই, বোন, মা বা অন্যান্য ওয়ারিশের এনআইডি ও ফারায়েজ অনুযায়ী অংশ (যেমন: ০.১২৫০ বা ০.২৫০০ অংশ) উল্লেখ করুন।
  4. প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস আপলোড: ওয়ারিশ সনদ, মৃত্যু সনদ, রেকর্ডিয় খতিয়ান ও খাজনার দাখিলার রঙিন স্ক্যান কপি আপলোড করুন।
  5. সরকারি ফি (৭০ টাকা) পরিশোধ: কোর্ট ফি ২০ টাকা ও নোটিশ জারি ফি ৫০ টাকা—মোট ৭০ টাকা অনলাইনে পরিশোধ করে আবেদন আইডি (Application ID) সংরক্ষণ করুন।

৪. সহ-ওয়ারিশদের আপত্তি বা বিরোধ থাকলে আইনি সমাধান

যদি ওয়ারিশদের মধ্যে জমি নিয়ে বিরোধ থাকে অথবা কোনো সহ-ওয়ারিশ নামজারিতে সম্মতি দিতে না চান, তবে:

  • সহকারী কমিশনার (ভূমি) সকল ওয়ারিশের ঠিকানায় সরকারি শুনানির নোটিশ জারি করবেন। শুনানিতে উপস্থিত হয়ে প্রত্যেক ওয়ারিশকে তার অংশ বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
  • কোনো ওয়ারিশকে ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন করে বা বাদ দিয়ে ভুয়া ওয়ারিশ সনদে নামজারি করা ফৌজদারি দণ্ডবিধির আওতায় প্রতারণা ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এমন খতিয়ান পরবর্তীতে বাতিলযোগ্য।
  • জমি নিয়ে দেওয়ানি আদালতে বণ্টন মোকদ্দমা (Title Partition Suit) চলমান থাকলে এসিল্যান্ড নামজারি প্রক্রিয়া স্থগিত রাখতে পারেন।

৫. ওয়ারিশান নামজারি সংক্রান্ত বহুল জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলি (FAQ)

প্রশ্ন: বিবাহিত বোনেরা কি পৈতৃক জমির নামজারিতে অংশ পাবেন?

হ্যাঁ, শতভাগ। মুসলিম ও অন্যান্য উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী পিতার সম্পত্তিতে কন্যাদের হিস্যা সুনির্দিষ্ট। বোনদের বাদ দিয়ে কেবল ভাইদের নামে নামজারি আবেদন করলে তা আইনত বাতিল হবে।

প্রশ্ন: কোনো ওয়ারিশ প্রবাসে বা বিদেশে থাকলে কীভাবে আবেদন করবেন?

প্রবাসে থাকা ওয়ারিশের এনআইডি বা পাসপোর্ট নম্বর দিয়ে সহ-ওয়ারিশ হিসেবে যুক্ত করা যাবে। অথবা তিনি সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ দূতাবাস/হাইকমিশন থেকে বিশেষ আমমোক্তারনামা (Power of Attorney) অনুমোদন করিয়ে দেশে প্রতিনিধির মাধ্যমে আবেদন করাতে পারেন।

প্রশ্ন: যৌথ নামজারির পর কি সরকারি ফি বেশি লাগে?

না। ওয়ারিশান যৌথ খতিয়ানের ক্ষেত্রেও নিয়মিত মোট সরকারি ফি নির্ধারিত ১,১৭০ টাকাই প্রযোজ্য। বিস্তারিত দেখুন আমাদের মূল নামজারি ও ফি নির্দেশিকা পেজে।

সর্বশেষ হালনাগাদ: 24 October 2026 বিভাগ: নামজারি ও ই-মিউটেশন

নামজারি ও ই-মিউটেশন বিভাগের অন্যান্য সম্পর্কিত গাইড

নামজারি আবেদনের বর্তমান অবস্থা (Status) চেক ও ট্র্যাকিং → নামজারি বাতিল বা না-মঞ্জুর হলে করণীয় ও আইনি প্রতিকার →